চীন-মার্কিন পাল্টাপাল্টি বন্দর ফি আরোপের প্রভাব

সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনকারী জাহাজের সংখ্যা কমছে

একে অন্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পণ্যবাহী জাহাজের ওপর পাল্টাপাল্টি অতিরিক্ত বন্দর ফি আরোপ করেছে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র।

একে অন্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পণ্যবাহী জাহাজের ওপর পাল্টাপাল্টি অতিরিক্ত বন্দর ফি আরোপ করেছে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক পণ্য বাণিজ্যে। কমতে শুরু করেছে পণ্য পরিবহনকারী জাহাজের সংখ্যা। বাড়ছে পণ্য পরিবহনের ভাড়াও। এর ধারাবাহিকতায় বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার জোর আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। শেষ পর্যন্ত এ বাড়তি ফি ভোক্তাদেরই বহন করতে হবে বলে মনে করছেন তারা। খবর রয়টার্স।

বাড়তি খরচ এড়াতে ১৪ অক্টোবর থেকে চীনসংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে মার্কিন বাণিজ্য রুট থেকে সরিয়ে নিতে থাকেন জাহাজ অপারেটররা। একইভাবে পাল্টা ফি এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কিত জাহাজগুলোকে চীনের বন্দর থেকে দূরে রাখা হচ্ছে। বৈশ্বিক পণ্য আমদানি ও রফতানি—দুই ক্ষেত্রেই শীর্ষ দুটি অবস্থান চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের দখলে। এ দুই দেশসংশ্লিষ্ট পণ্য পরিবহনকারী জাহাজগুলো একে অন্যের বন্দর এড়িয়ে চলায় চাপে পড়েছে বৈশ্বিক নৌ-পরিবহন খাত। হঠাৎ করেই সমুদ্র বাণিজ্যে দেখা দিয়েছে বাহন সংকট।

অতিরিক্ত বন্দর ফি এড়াতে এ দুই দেশের জাহাজগুলোকে এখন রুট পরিবর্তন করে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পণ্য ডেলিভারির লিড টাইম বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি ফি পরিশোধ করতে হবে না, এমন জাহাজের চাহিদা এখন বাড়ছে।

ড্রাই বাল্ক শিপিং কোম্পানি সিনার্জি মেরিটাইম হোল্ডিংসের সিইও স্টামাটিস জান্টানিস বলেন, ‘চীনের বন্দরগুলোয় পণ্য পরিবহনে জাহাজের তালিকা নিশ্চিতভাবে আগের চেয়ে সংকুচিত হয়েছে। সব ধরনের জাহাজের ক্ষেত্রে এ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।’

বিষয়টি এখন ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হয়ে উঠতে যাচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্টামাটিস জান্টানিস। তিনি বলেন, ‘আসলে শেষ পর্যন্ত সব খরচ ভোক্তাদের ঘাড়ের ওপর পড়বে। ফলে সব পণ্য অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে যাবে।’

পাল্টাপাল্টি বন্দর ফি বৃদ্ধির এ পদক্ষেপের কারণে এরই মধ্যে জাহাজ ভাড়া বেড়েছে। মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক জেফেরিসের বিশ্লেষক ওমর নোকতা একটি নোটে বলেছেন, সাংহাই কন্টেইনারাইজড ফ্রেইট ইনডেক্স (এসসিএফআই) ১২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে চার সপ্তাহের সর্বোচ্চে পৌঁছেছে। মূলত ট্রান্সপ্যাসিফিক রুটে ভাড়া বাড়ার কারণে সূচকটি ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। গত সপ্তাহে চীন নতুন এ বন্দর ফি ঘোষণা করে। এর পর থেকে জাহাজ ভাড়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

অবশ্য বাণিজ্যযুদ্ধের ময়দানে সমুদ্রবন্দরকে প্রথমে টেনে এনেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এপ্রিলের শুরুর দিকে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, চীনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেকোনো জাহাজকে মার্কিন বন্দরে ১৪ অক্টোবর থেকে বাড়তি ফি পরিশোধ করতে হবে। জো বাইডেনের সময়ে পরিচালিত এক তদন্তের ভিত্তিতে এ পদক্ষেপ নেয়া হয়। যার উদ্দেশ্য হলো বৈশ্বিক সমুদ্র পরিবহন খাতে চীনের প্রভাব হ্রাস ও মার্কিন জাহাজ নির্মাণ শিল্পের পুনরুজ্জীবন।

বেইজিং গত সপ্তাহে চীন থেকে দুষ্প্রাপ্য খনিজ রফতানিতে আরো কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের ঘোষণা দেয়। জবাবে চীনা পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন মালিকানাধীন, পরিচালিত, নির্মিত বা পতাকাবাহী জাহাজের ওপর বিশেষ চার্জ ঘোষণা করে চীন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাল্টাপাল্টি এ বন্দর ফি আরোপের ঘটনায় চীনের ক্ষতি হবে বেশি। কারণ বৈশ্বিক জাহাজ নির্মাণ শিল্পের প্রায় অর্ধেকই দেশটির দখলে। মার্কিন বন্দরের ফি এড়িয়ে চলার জন্য এরই মধ্যে মায়েরস্ক, হ্যাপাগ-লয়েড ও সিএমএ সিজিএমসহ প্রধান কনটেইনার শিপিং লাইনগুলো জাহাজের বাণিজ্য রুট পুনর্বিন্যাস করেছে।

চলতি সপ্তাহে শিপিং জোট জেমিনি অ্যালায়েন্সের সদস্য মায়েরস্ক ও হ্যাপাগ-লয়েড গ্রাহকদের জানিয়ে দিয়েছে, নিংবো বন্দরে যাবে না মায়েরস্ক কিনলস ও পোটোম্যাক এক্সপ্রেক্স জাহাজ। মার্কিন পতাকাবাহী ও দক্ষিণ কোরিয়ায় নির্মিত জাহাজ দুটি এতদিন শুধু পণ্যের চীনমুখী চালান নিয়ে চলাচল করেছে।

আর্ডমোর শিপিংয়ের সিইও গেরনট রুপেল্ট বলেন, ‘নতুন নিয়ম জাহাজ চলাচল ও বাণিজ্য প্রবাহকে আরো বিচ্ছিন্ন করবে। বিষয়টির প্রভাব জটিল হওয়ায় ভাড়া কত বাড়বে, বাজার এখনো তা ঠিক করে উঠতে পারেনি।’

যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত ও দেশটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজে পাল্টা ফি আরোপ করায় চীনমুখী অপরিশোধিত জ্বালানি তেলবাহী বড় জাহাজের ভাড়া বেড়ে গেছে। চীন বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিকারক। তাই এ খাতে ভাড়া বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক শিপিং বাজারকে প্রভাবিত করবে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলবাহী বড় ট্যাংকার ভিএলসিসির ভাড়া এরই মধ্যে দুই সপ্তাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে পরে কিছুটা কমেছে। এছাড়া বাড়তি ফি এড়িয়ে চলার কারণে চার্টারযোগ্য ট্যাংকারের সরবরাহ কমে গেছে।

পরামর্শ সংস্থা এনার্জি অ্যাসপেক্টস চলতি বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) ভিএলসিসির ভাড়া বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। সেখানে আরো বলা হচ্ছে, সমুদ্র বাণিজ্যে যদি বিঘ্ন আরো বেড়ে যায়, ভাড়ার ওপর আরো চাপ আসতে পারে।

ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান গিবসন শিপব্রোকার্স বলছে, চীনে নির্মিত জাহাজগুলো চীনের বন্দর ফি থেকে অব্যাহতি পেয়েছে, যা সম্ভাব্য প্রভাব কিছুটা সহনীয় করেছে। তবে মার্কিন মালিকানাধীন বা পরিচালিত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জাহাজে এর প্রভাব দেখতে পাচ্ছি আমরা।

নতুন ফির কারণে প্রভাবিত হয়েছে কয়লা, লোহা, শস্য ও লবণের মতো ড্রাই বাল্ক পণ্যবাহী জাহাজগুলো। সিনার্জির তথ্যানুসারে, এতে প্রায় ৬০-৭০টি জাহাজ প্রভাবিত হয়েছে, যা প্রায় এক লাখ থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার ডেডওয়েট টন পণ্য পরিবহনে সক্ষম ক্যাপিসাইজ ফ্লিটের প্রায় ৩ শতাংশ।

স্টামাটিস জান্টানিস বলেন, ‘চীনে বেশি পণ্য নামানোর কারণে ফির প্রভাব সেখানে বেশি। তাই বাজারে এর প্রভাব পড়বে। এরই মধ্যে জাহাজের সরবরাহ কমে গেছে।’

আরও